রাত সাড়ে ১১ টায় তুর্না নিশিতা ট্রেন।
বিমানবন্দর স্টেশনে শত মানুষের ভীর। একটা
সীটে বসে পেপার পড়ছে এস.এইচ রুবেল। বাম হাত
উঁচু করে সময় দেখতে গেলো তখনই মনে পরলো হাত
ঘড়ি ভুলে ফেলে এসেছে। পকেট থেকে মোবাইল ফোন
বের করতে যাবে তখনই সামনে এসে এক মহিলা
বলল, "১১ টা ১০ মিনিট এখন।" চমকে তাকালো
মহিলার দিকে। কাঁচা পাকা চুলের মধ্য বয়স্ক
মহিলা। নাকের উপরে চশমাটা হাসি খুশি
চেহারাটায় একটা গাম্ভীর্য এনে দিয়েছে।
: আপনি। মানে তুমি ছানোয়ারা না।
: চিনতে পেরেছেন তাহলে?
: একটু কষ্ট হয়েছে। কিন্তু ঠিক চিনে নিয়েছি।
: তাই তো দেখছি। বসতে পারি?
: ও হ্যাঁ! নিশ্চয়।
বলে এস এইচ রুবেল জায়গা করে দিলো। পাশে বসে
হ্যান্ড ব্যাগটা কোলে নিয়ে রুবেলের দিকে
তাকিয়ে হালকা হাসি দিলো। রুবেলের মনে হলো
মানুষের হাসির বুঝি বয়স বাড়ে না। ২৬ বছর আগের
সেই হাসি। যেদিন প্রথম ছানোয়ারাকে দেখেছিলাম। সেদিনের
সেই হাসির সাথে তেমন কোন তফাৎ নেই কানের
পাশে কাঁচাপাকা চুল আর চশমাটা ছাড়া।
: হাত ঘড়ি আনতে ভুলে গেছেন বুঝি?
: ভুলে ফেলে এসেছি। উত্তরায় এসেছিলাম মেয়ের
বাড়িতে। নাতিটা লুকিয়ে রেখেছিলো আমায় আসতে
দেবে না বলে। পরে আর ঘড়ির কথা মনে পরেনি
তাড়াহুড়ো করে বেড়ুতে গিয়ে।
: বাব্বাহ! নানাও হয়ে গেছেন?
: হা হা হা! বয়স কিন্তু থেমে থাকেনি ছানোয়ারা।
আমাদের বয়স যদি রেলওয়ের ট্রেনের মতো হতো
এখনো আমার সেই আগের মত থাকার কথা ছিল।
আর তোমার কিন্ডারগার্টেনে। হা হা হা!
: আপনি এখনো আগের মতোই আছেন। রসিকতাটা
ছাড়েননি দেখছি।
: বুড়ো হলে মানুষ একটু রসিকই হয়।
: আপনি তো তাহলে সেই জন্ম থেকেই বুড়ো। ছেলে
মেয়ে ক'জন?
: দুটোই মেয়ে। বড়জনের নাম ছামিয়া। আর
ছোট মেয়ের...
: রূপকথা!
: তুমি জানলে কি করে।
: এবার আপনি কিন্তু আমায় হাসালেন মশায়।
আপনার সব স্বপ্নের কথা আমায় বলতেন। আপনার ছেলে মেয়েদের নাম কি রাখবেন।
একটা হলে কি রাখবেন দু'টো হলে কি রাখবেন। বউ
কে নিয়ে কোথায় হানিমুনে যাবেন। কোন দোকানে
চা খাবেন। শুধু বউটা কে হবে সেটাই কেউ জানতো
না।
: এতোকিছু তোমার মনে আছে এতো বছর পরেও।
: আমার সব মনে আছে। কোন ব্রান্ডের সিগারেট
খেতেন। কি করে খেতেন। কোন শার্টটা আপনার
পছন্দের ছিল। সব মনে আছে।
: তোমার ছেলে মেয়ে ক'জন?
: আপনার মতই। তবে ছেলে। দুই ছেলে।
: বাহ! আগে জানলে তো বেয়াই হতে পারতাম।
: আপনি চাইলে ওরা ভাই বোন হতে পারতো।
কথাটা বলেই মাথা নিচু করে ফেললো ছানোয়ারা। মুখ
ফসকে এমন একটা কথা বলে ফেলে লজ্জায় পরে
গেল। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে নিলো রুবেল।
: হা হা হা! এমন একটা চুটকি সেদিন কোথায় যেন
পড়েছিলাম। চুটকি এমন ছিল...
: আমি জানি। সেখান থেকেই মজা করার জন্যই
বলেছি। আচ্ছা আজ কতোদিন পরে আপনার সাথে
দেখা বলতে পারবেন?
: ঠিক মনে পরছে না। সম্ভবত ২০ পঁচিশ বছর পরে।
: আঠাশ বছর পরে। আমি আপনাকে
পেয়েছিলাম মাত্র দেড় বছর।
এমন সময় মাইকে এনাউন্স হলো, আর কিছুক্ষনের
মধ্যেই কমলাপুর থেকে ছেড়ে আসা চট্টগ্রাম গামী
তুর্না নিশিতা ট্রেন বিমান বন্দর স্টেশনে প্রবেশ
করবে।
: ছানোয়ারা আমার ট্রেন আসছে। জিজ্ঞেস করতেই ভুলে
গেছি কোথায় যাবে।
: থাক বাদ দেন। আপনার আমার গন্তব্য অনেক আগে
থেকেই আলাদা হয়ে গেছে। আপনার বউ কি অনেক
রোমান্টিক! যেমনটা বলতেন কেমন মেয়ে
বিয়ে করবেন।
: মানুষ কি সব সময় তার ইচ্ছের মতো জীবনটা
পায়।
: মাঝরাতে বউকে নিয়ে বৃষ্টিতে ছাদে গিয়ে
ভিজেন নি কখনো?
: ওর সাইনোসাইটিসের সমস্যা। ঠান্ডায় অনেক
কষ্ট পায়। আর এই বুড়ো বয়সে এসে এসব কে ভাবে
বলোতো। তোমার কথা বার্তা এখনো কিশোরীদের
মতোই।
: একটা কথা আপনাকে বলি। কিছু মনে করবেন না।
কথাটা আপনাকে বলতে না পারলে একটা আফসোস
থেকে যাবে। যদিও এই বয়সে এসে এসব কথা
মানায় না। হাস্যকর শোনায়। তবুও আমার উত্তরটা
খুব দরকার।
: বলো?আমি যে আপনাকে পাগলের মতো ভালবাসতাম
সেটা কি আপনি জানতেন?
: হুম জানতাম। আমার ফেলে দেওয়া সিগারেটের
ফিল্টার গুলো তুমি কুড়িয়ে নিয়ে যেতে। কে যেন
বলেছিলো এসব আমায়। তবে আমার বিয়ের অনেক
বছর পরে। কিন্তু আমার প্রতি তোমার যে একটা
ব্যাপার আছে সেটা বুঝতে পারতাম।
: আমায় আপনার ভাল লাগতো না?
: না লাগলে কি আমার ছোট মেয়ের নাম ছানোয়ারা
রাখতাম।
: স-ত্যি-ই ছানোয়ারা রেখেছেন?
: এই নামেই ওকে সবাই ডাকে।
: ভাল লাগার কথাটা বলেননি কেন?
: আমায় তুমি পছন্দ করতে এই ভাবনাটাই আমার ভাল
লাগতো।
: আপনার বউয়ের জন্য কি বেলি ফুলের মালা নিয়ে
যান।
: ওর গোলাপ পছন্দ। বেলি ফুলের গন্ধ ওর ভাল
লাগে না। কয়েকবার নেয়ার পরে আর নেয়া হয়নি।
সেও তো মেলা আগের কথা। ভুলেই গিয়েছি সেই সব
স্বপ্নের কথা।
: পূর্ণিমারাতে বউকে সারারাত কবিতা আবৃত্তি
করে শোনাবেন বলতেন। রবীঠাকুরের হঠাৎ দেখা,
ক্যামেলিয়া সব মুখস্ত ছিল আপনার।
: হা হা হা! আর কবিতা। একটা ব্যাপার খেয়াল
করেছো। হঠাৎ দেখা কবিতার মতই তোমার সাথে
আমার আবার দেখা হয়ে গেল। তবে একই কামড়ায়
নয়। স্টেশন প্লাটফ্রমে। রেল গাড়ির কামড়ায়
হঠাৎ দেখা ভাবিনি সম্ভব হবে কোনদিন...
: থামলেন কেন। বলুন না। কতো বছর পরে আপনার মুখ
থেকে কবিতা শুনছি।
বিকট হুইসেল গিয়ে স্টেশনের দিকে এগিয়ে আসছে
ট্রেন। ছানোয়ারা বুকটা ধক করে উঠলো। রুবেল
নিজের অজান্তেই দাঁড়িয়ে গেল। সিটের পাশের
লাগেজটা টেনে নিলো।
: ট্রেন চলে আসছে ছানোয়ারা।
: চলেই যাবেন...
কথাটা বলতেই গলার কাছে কান্নার দলা পাকালো।
ছানোয়ারার খুব করে বলতে ইচ্ছে করছে। যা বলেছি
সব মিথ্যে। আমার কোন ছেলে নেই। বিয়ে
হয়েছিলো একবার। টেকেনি। কি করে টিকবে। সে
তো আমার জন্য বেলি ফুলের মালা নিয়ে আসতো না।
বর্ষাকাল ছিল তার অপছন্দের ঋতু। সারারাত
পূর্ণিমায় ভেসে যেতো পুরো শহর। আর সে নাক
ডেকে ঘুমুতো। আমি তো আপনার কাছ থেকেই
ভালবাসা কি জিনিশ আবেগ কি জিনিশ সেটা
শিখেছি। আর কেউ আমায় কি করে সুখে রাখতে
পারতো আপনি ছাড়া। প্রতিবন্ধী দাম্পত্য জীবন
ছিন্ন করে একা একাই বেঁচে আছি ছোট ভাইয়ের
সংসারে।
: ছানোয়ারা আমায় যেতে হবে। ভাল থেকো। ট্রেন
থেমেছে। আমার "জ" বগি। একদম সামনের দিকে।
: সাবধানে যাবেন।
: যাই ছানোয়ারা।
ট্রলি লাগেজ নিয়ে হাঁটা দিলো এস.এইচ রুবেল।
মানুষের ছোটাছুটি তে একটু হিমিশিম খাচ্ছেন।
ছানোয়ারা গুটি গুটি পায়ে পিছনে পিছনে আসছে।
: আচ্ছা আপনি কি এখনো চায়ে তিন কাপ চিনি
খান?
রুবেল থমকে দাঁড়িয়ে পিছন ফিরলো। মানুষের
ধাক্কায় একটু খেই হারিয়ে ফেললো।
: না। ডাক্তারের বারন। তবুও আধ চামচ খাই।
ছানোয়ারা ভাল থেকো। যাই।
: আপনাকে এক প্যাকেট সিগারেট কিনে দেই?
: সময় নেই ছানোয়ারা। যাই।
হাঁটতে শুরু করলো রুবেল। পিছনে পিছনে ছানোয়ারাও
হাঁটছে। রুবেল ওর বগির প্রায় কাছেই পৌঁছে
গেছে। ছানোয়ারা ভিতরে ভিতরে গুমরে উঠলো।
: আমার হাতটা একটু ধরবেন?
তখনই তীব্র হুইসেল বাজিয়ে ট্রেন চলতে শুরু
করলো। ছানোয়ারার শেষ কথাটি আর রুবেলের কানে
গিয়ে পৌছালো না। রুবেল দ্রুত লাগেজ নিয়ে "চ"
বগিতে উঠে গেল।
ছানোয়ারা দাঁড়িয়ে আছে আবছা আলোর অন্ধকারে। তুর্না
নিশিতা চলে যাচ্ছে ঢাকা শহর ছেড়ে। তখনি
ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামলো। ট্রেনের আওয়াজ আস্তে
আস্তে দূরে সরে যাচ্ছে। ট্রেনটা কি জানে সে
কারো বুকটা ফাঁকা করে নিয়ে যাচ্ছে।
ছানোয়ারা হাত বাড়িয়ে বৃষ্টি ছুঁলো। ওর মনে হচ্ছে,
আচ্ছা আজ আর ঘরে ফিরে না গেলে কি হয়। আর যদি
কোনদিনই ফেরা না হয়। কি আসবে যাবে। আজ আমি
ভিজবো। অনন্তকালের জন্য ভিজবো। আকাশ, তুই শুধু
আজ আমার জন্যই বৃষ্টি ঝরা। আচ্ছা, রুবেল কি
জানে আমার সাইনোসাইটিসের কোন সমস্যা নেই?
বিমানবন্দর স্টেশনে শত মানুষের ভীর। একটা
সীটে বসে পেপার পড়ছে এস.এইচ রুবেল। বাম হাত
উঁচু করে সময় দেখতে গেলো তখনই মনে পরলো হাত
ঘড়ি ভুলে ফেলে এসেছে। পকেট থেকে মোবাইল ফোন
বের করতে যাবে তখনই সামনে এসে এক মহিলা
বলল, "১১ টা ১০ মিনিট এখন।" চমকে তাকালো
মহিলার দিকে। কাঁচা পাকা চুলের মধ্য বয়স্ক
মহিলা। নাকের উপরে চশমাটা হাসি খুশি
চেহারাটায় একটা গাম্ভীর্য এনে দিয়েছে।
: আপনি। মানে তুমি ছানোয়ারা না।
: চিনতে পেরেছেন তাহলে?
: একটু কষ্ট হয়েছে। কিন্তু ঠিক চিনে নিয়েছি।
: তাই তো দেখছি। বসতে পারি?
: ও হ্যাঁ! নিশ্চয়।
বলে এস এইচ রুবেল জায়গা করে দিলো। পাশে বসে
হ্যান্ড ব্যাগটা কোলে নিয়ে রুবেলের দিকে
তাকিয়ে হালকা হাসি দিলো। রুবেলের মনে হলো
মানুষের হাসির বুঝি বয়স বাড়ে না। ২৬ বছর আগের
সেই হাসি। যেদিন প্রথম ছানোয়ারাকে দেখেছিলাম। সেদিনের
সেই হাসির সাথে তেমন কোন তফাৎ নেই কানের
পাশে কাঁচাপাকা চুল আর চশমাটা ছাড়া।
: হাত ঘড়ি আনতে ভুলে গেছেন বুঝি?
: ভুলে ফেলে এসেছি। উত্তরায় এসেছিলাম মেয়ের
বাড়িতে। নাতিটা লুকিয়ে রেখেছিলো আমায় আসতে
দেবে না বলে। পরে আর ঘড়ির কথা মনে পরেনি
তাড়াহুড়ো করে বেড়ুতে গিয়ে।
: বাব্বাহ! নানাও হয়ে গেছেন?
: হা হা হা! বয়স কিন্তু থেমে থাকেনি ছানোয়ারা।
আমাদের বয়স যদি রেলওয়ের ট্রেনের মতো হতো
এখনো আমার সেই আগের মত থাকার কথা ছিল।
আর তোমার কিন্ডারগার্টেনে। হা হা হা!
: আপনি এখনো আগের মতোই আছেন। রসিকতাটা
ছাড়েননি দেখছি।
: বুড়ো হলে মানুষ একটু রসিকই হয়।
: আপনি তো তাহলে সেই জন্ম থেকেই বুড়ো। ছেলে
মেয়ে ক'জন?
: দুটোই মেয়ে। বড়জনের নাম ছামিয়া। আর
ছোট মেয়ের...
: রূপকথা!
: তুমি জানলে কি করে।
: এবার আপনি কিন্তু আমায় হাসালেন মশায়।
আপনার সব স্বপ্নের কথা আমায় বলতেন। আপনার ছেলে মেয়েদের নাম কি রাখবেন।
একটা হলে কি রাখবেন দু'টো হলে কি রাখবেন। বউ
কে নিয়ে কোথায় হানিমুনে যাবেন। কোন দোকানে
চা খাবেন। শুধু বউটা কে হবে সেটাই কেউ জানতো
না।
: এতোকিছু তোমার মনে আছে এতো বছর পরেও।
: আমার সব মনে আছে। কোন ব্রান্ডের সিগারেট
খেতেন। কি করে খেতেন। কোন শার্টটা আপনার
পছন্দের ছিল। সব মনে আছে।
: তোমার ছেলে মেয়ে ক'জন?
: আপনার মতই। তবে ছেলে। দুই ছেলে।
: বাহ! আগে জানলে তো বেয়াই হতে পারতাম।
: আপনি চাইলে ওরা ভাই বোন হতে পারতো।
কথাটা বলেই মাথা নিচু করে ফেললো ছানোয়ারা। মুখ
ফসকে এমন একটা কথা বলে ফেলে লজ্জায় পরে
গেল। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে নিলো রুবেল।
: হা হা হা! এমন একটা চুটকি সেদিন কোথায় যেন
পড়েছিলাম। চুটকি এমন ছিল...
: আমি জানি। সেখান থেকেই মজা করার জন্যই
বলেছি। আচ্ছা আজ কতোদিন পরে আপনার সাথে
দেখা বলতে পারবেন?
: ঠিক মনে পরছে না। সম্ভবত ২০ পঁচিশ বছর পরে।
: আঠাশ বছর পরে। আমি আপনাকে
পেয়েছিলাম মাত্র দেড় বছর।
এমন সময় মাইকে এনাউন্স হলো, আর কিছুক্ষনের
মধ্যেই কমলাপুর থেকে ছেড়ে আসা চট্টগ্রাম গামী
তুর্না নিশিতা ট্রেন বিমান বন্দর স্টেশনে প্রবেশ
করবে।
: ছানোয়ারা আমার ট্রেন আসছে। জিজ্ঞেস করতেই ভুলে
গেছি কোথায় যাবে।
: থাক বাদ দেন। আপনার আমার গন্তব্য অনেক আগে
থেকেই আলাদা হয়ে গেছে। আপনার বউ কি অনেক
রোমান্টিক! যেমনটা বলতেন কেমন মেয়ে
বিয়ে করবেন।
: মানুষ কি সব সময় তার ইচ্ছের মতো জীবনটা
পায়।
: মাঝরাতে বউকে নিয়ে বৃষ্টিতে ছাদে গিয়ে
ভিজেন নি কখনো?
: ওর সাইনোসাইটিসের সমস্যা। ঠান্ডায় অনেক
কষ্ট পায়। আর এই বুড়ো বয়সে এসে এসব কে ভাবে
বলোতো। তোমার কথা বার্তা এখনো কিশোরীদের
মতোই।
: একটা কথা আপনাকে বলি। কিছু মনে করবেন না।
কথাটা আপনাকে বলতে না পারলে একটা আফসোস
থেকে যাবে। যদিও এই বয়সে এসে এসব কথা
মানায় না। হাস্যকর শোনায়। তবুও আমার উত্তরটা
খুব দরকার।
: বলো?আমি যে আপনাকে পাগলের মতো ভালবাসতাম
সেটা কি আপনি জানতেন?
: হুম জানতাম। আমার ফেলে দেওয়া সিগারেটের
ফিল্টার গুলো তুমি কুড়িয়ে নিয়ে যেতে। কে যেন
বলেছিলো এসব আমায়। তবে আমার বিয়ের অনেক
বছর পরে। কিন্তু আমার প্রতি তোমার যে একটা
ব্যাপার আছে সেটা বুঝতে পারতাম।
: আমায় আপনার ভাল লাগতো না?
: না লাগলে কি আমার ছোট মেয়ের নাম ছানোয়ারা
রাখতাম।
: স-ত্যি-ই ছানোয়ারা রেখেছেন?
: এই নামেই ওকে সবাই ডাকে।
: ভাল লাগার কথাটা বলেননি কেন?
: আমায় তুমি পছন্দ করতে এই ভাবনাটাই আমার ভাল
লাগতো।
: আপনার বউয়ের জন্য কি বেলি ফুলের মালা নিয়ে
যান।
: ওর গোলাপ পছন্দ। বেলি ফুলের গন্ধ ওর ভাল
লাগে না। কয়েকবার নেয়ার পরে আর নেয়া হয়নি।
সেও তো মেলা আগের কথা। ভুলেই গিয়েছি সেই সব
স্বপ্নের কথা।
: পূর্ণিমারাতে বউকে সারারাত কবিতা আবৃত্তি
করে শোনাবেন বলতেন। রবীঠাকুরের হঠাৎ দেখা,
ক্যামেলিয়া সব মুখস্ত ছিল আপনার।
: হা হা হা! আর কবিতা। একটা ব্যাপার খেয়াল
করেছো। হঠাৎ দেখা কবিতার মতই তোমার সাথে
আমার আবার দেখা হয়ে গেল। তবে একই কামড়ায়
নয়। স্টেশন প্লাটফ্রমে। রেল গাড়ির কামড়ায়
হঠাৎ দেখা ভাবিনি সম্ভব হবে কোনদিন...
: থামলেন কেন। বলুন না। কতো বছর পরে আপনার মুখ
থেকে কবিতা শুনছি।
বিকট হুইসেল গিয়ে স্টেশনের দিকে এগিয়ে আসছে
ট্রেন। ছানোয়ারা বুকটা ধক করে উঠলো। রুবেল
নিজের অজান্তেই দাঁড়িয়ে গেল। সিটের পাশের
লাগেজটা টেনে নিলো।
: ট্রেন চলে আসছে ছানোয়ারা।
: চলেই যাবেন...
কথাটা বলতেই গলার কাছে কান্নার দলা পাকালো।
ছানোয়ারার খুব করে বলতে ইচ্ছে করছে। যা বলেছি
সব মিথ্যে। আমার কোন ছেলে নেই। বিয়ে
হয়েছিলো একবার। টেকেনি। কি করে টিকবে। সে
তো আমার জন্য বেলি ফুলের মালা নিয়ে আসতো না।
বর্ষাকাল ছিল তার অপছন্দের ঋতু। সারারাত
পূর্ণিমায় ভেসে যেতো পুরো শহর। আর সে নাক
ডেকে ঘুমুতো। আমি তো আপনার কাছ থেকেই
ভালবাসা কি জিনিশ আবেগ কি জিনিশ সেটা
শিখেছি। আর কেউ আমায় কি করে সুখে রাখতে
পারতো আপনি ছাড়া। প্রতিবন্ধী দাম্পত্য জীবন
ছিন্ন করে একা একাই বেঁচে আছি ছোট ভাইয়ের
সংসারে।
: ছানোয়ারা আমায় যেতে হবে। ভাল থেকো। ট্রেন
থেমেছে। আমার "জ" বগি। একদম সামনের দিকে।
: সাবধানে যাবেন।
: যাই ছানোয়ারা।
ট্রলি লাগেজ নিয়ে হাঁটা দিলো এস.এইচ রুবেল।
মানুষের ছোটাছুটি তে একটু হিমিশিম খাচ্ছেন।
ছানোয়ারা গুটি গুটি পায়ে পিছনে পিছনে আসছে।
: আচ্ছা আপনি কি এখনো চায়ে তিন কাপ চিনি
খান?
রুবেল থমকে দাঁড়িয়ে পিছন ফিরলো। মানুষের
ধাক্কায় একটু খেই হারিয়ে ফেললো।
: না। ডাক্তারের বারন। তবুও আধ চামচ খাই।
ছানোয়ারা ভাল থেকো। যাই।
: আপনাকে এক প্যাকেট সিগারেট কিনে দেই?
: সময় নেই ছানোয়ারা। যাই।
হাঁটতে শুরু করলো রুবেল। পিছনে পিছনে ছানোয়ারাও
হাঁটছে। রুবেল ওর বগির প্রায় কাছেই পৌঁছে
গেছে। ছানোয়ারা ভিতরে ভিতরে গুমরে উঠলো।
: আমার হাতটা একটু ধরবেন?
তখনই তীব্র হুইসেল বাজিয়ে ট্রেন চলতে শুরু
করলো। ছানোয়ারার শেষ কথাটি আর রুবেলের কানে
গিয়ে পৌছালো না। রুবেল দ্রুত লাগেজ নিয়ে "চ"
বগিতে উঠে গেল।
ছানোয়ারা দাঁড়িয়ে আছে আবছা আলোর অন্ধকারে। তুর্না
নিশিতা চলে যাচ্ছে ঢাকা শহর ছেড়ে। তখনি
ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামলো। ট্রেনের আওয়াজ আস্তে
আস্তে দূরে সরে যাচ্ছে। ট্রেনটা কি জানে সে
কারো বুকটা ফাঁকা করে নিয়ে যাচ্ছে।
ছানোয়ারা হাত বাড়িয়ে বৃষ্টি ছুঁলো। ওর মনে হচ্ছে,
আচ্ছা আজ আর ঘরে ফিরে না গেলে কি হয়। আর যদি
কোনদিনই ফেরা না হয়। কি আসবে যাবে। আজ আমি
ভিজবো। অনন্তকালের জন্য ভিজবো। আকাশ, তুই শুধু
আজ আমার জন্যই বৃষ্টি ঝরা। আচ্ছা, রুবেল কি
জানে আমার সাইনোসাইটিসের কোন সমস্যা নেই?

No comments:
Post a Comment
thank you...